হজে যাওয়ার আগে যে প্রস্তুতি গ্রহণ এখনই জরুরি

31

পূণ্যভূমি মক্কা আল-মুকাররামা অপরূপ শোভা লাভ করতে শুরু করেছে। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অংকুরিত ভালোবাসার ফুল ফুটবে সেখানে। সারা বিশ্ব থেকে আগত মুমিনের বিশ্ব মুসলিম সম্মিলন শুরু হবে। মুমিন মুসলমানের এ মিলনমেলা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ ইবাদত।

এ ফরজ ইবাদত পালনে মক্কা নগরীতে অবস্থিত পবিত্র কাবাকে স্বাগত জানিয়ে মুসলিম উম্মাহ এক সুরে এক আওয়াজে গাইবে- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক; লা শারিকা লাক’।

পরম মমতায় বাইতুল্লাহ তার দর্শণার্থীদেরকে স্বাগত জানাবে। বেহেশতি পরিবেশে অবস্থান করবে মুসলিম মিল্লাত। যে স্থানে রয়েছে হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পদচিহ্ন।

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শীতল ও শান্তির পবিত্র স্পর্শ রয়েছে বর্তমান কাবা শরিফ, মুলতাজেম, হাজরে আসওয়াদ, হাতিমে কাবা ও পবিত্র কাবা চত্ত্বরে।

যেখানে শুয়ে বসে ইবাদতে সময় কাটিয়েছে প্রিয়নবি ও তার সাহাবাগণ। আজও সে আবেগ এবং বেহেশতি পরিবেশ সেখানে বিদ্যমান।

আল্লাহ তাআলা সেখানে নাজিল করছেন অবিরত রহমত বরকত কল্যাণ ও মাগফেরাতের ফল্গুধারা। দু’হাতে হৃদয় দিয়ে বুক চিতিয়ে সে রহমত বরকত কল্যাণ ও মাগফেরাত লাভ করছেন সারা বিশ্ব থেকে আগত মুমিন মুসলমান।

হে পূণ্য তীর্থের ভাগ্যবান যাত্রী! আল্লাহর ঘরে হাজিরা দিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণের এখনই সময়। দীর্ঘ মাসাধিককালের সফরে হজের কষ্টকর ও গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজগুলো যথাযথভাবে পালনে এখন থেকেই নিজেকে তৈরি করুন।

হজের সব কাজগুলোই মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার একান্ত নির্দশন। এ ইবাদত পালনে যেমন অর্থের যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা। ইবাদত পালনে থাকতে হবে তীক্ষ্ণ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

বাইতুল্লাহসহ আল্লাহর সব নিদর্শনগুলো পরিদর্শনে যেমন রয়েছে আনন্দ আবেগ ও ভালোবাসা তেমনি এ পবিত্র নিদর্শনগুলোর সম্মান ও মর্যাদার প্রতিও রাখতে বিশেষ খেয়াল। যাতে কোনোভাবেই এ স্থানগুলোর পবিত্রতা মর্যাদা ও সম্মান বিনষ্ট না হয়।

বাইতুল্লাহ দর্শনে চোখ জুড়াবে মুসলিম মিল্লাত। এ স্থানে চলছে অবিরাম তাওয়াফ। যা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘোষণার পর থেকে আজও চলছে অবিরাম গতিতে। এ ঘর যে আল্লাহর নির্দেশেই মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নিজ সন্তান ইসমাইলকে নিয়ে স্থাপন করেছেন।

তাঁর পদচিহ্ন মাকামে ইবরাহিম আজও বাইতুল্লাহর দরজার সামনেই স্মৃতি চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাথর যেন নিজেই ঘোষণা করছে, হে মুসলিম! এ যে তোমাদের পিতা ইবরাহিমের পদচিহ্ন অংকিত হয়েছে আমার বুকে।

বাইতুল্লাহর পাশে নির্মিত মসজিদে হারামের ভিতরে রয়েছে হজরত হাজেরার স্মৃতি বিজড়িত সাফা ও মারাওয়া পাহাড়। যেখানে তিনি সাতবার দৌড়িয়ে ছিলেন। যা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় হওয়ায় তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য সাফা-মারওয়ার সাঈকে আবশ্যক করে দিয়েছেন।

বিবি হাজেরার পেরেশানি ও দোয়ায় রহমতের ধারা ‘ঝমঝম’ পানির সরবরাহ রয়েছে পুরো বাইতুল্লাহর ভেতর-বাহির সব জায়গায়। যা পান করে হৃদয় জুড়ায় সারা বিশ্ব থেকে আগত আল্লাহর মেহমানু মুসলিম উম্মাহ।

মূল হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে জাবালে রহমতের পাদদেশে পবিত্র আরাফাতের ময়দানে। যে ময়দানে হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সালামের ঐতিহাসিক মিলনের স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে। সারা বিশ্ব থেকে আগত মুসলিম উম্মাহ তাওবা-ইসতেগফার ও কান্নার ধ্বনিতে মুখরিত হবে এ ময়দান।

প্রিয়নবির স্মৃতিবিজড়িত খোলা ময়দানে রাতযাপন মুজদালিফায়। রয়েছে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক শয়তানকে পাথর মারার স্মৃতি বিজড়িত মিনার কংকর নিক্ষেপ।

অতঃপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে মুসলিম উম্মাহ তারই নামে মনের পশুত্বকে খতম করতে স্মরক পশু কুরবানি সম্পন্ন করবে। শেষ হবে পূন্যভমি পবিত্র মক্কার হজের কার্যক্রম।

হজের এ কাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রয়োজন শারীরিক মানসিক ও আর্থিক সক্ষমতা। যাদের এ সবই রয়েছে তাদের জন্য হজ সম্পাদন করা ফরজ। তাইতো পবিত্র হজ পালনের আগে রয়েছে মুসলিম কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয়। সংক্ষেপে যার কিছু তুলে ধরা হলো-

হজে রওয়ানা হওয়ার আগে করণীয়

> বৈধ অর্থের উৎস থেকেই হজের সব ধরনের খরচের আঞ্জাম দেয়া।
> ইহরামের পোশাকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করা।
> পাসপোর্ট ও অর্থ রাখার জন্য কোমরবন্দ সংগ্রহ করা।
> পাড়া-পড়শিসহ নিকটআত্মীয়দের কাছ থেকে দায়-দাবি মুক্ত হওয়া।
> অসিয়ত থাকলে ওসিয়তনামা তৈরি করে রাখা।
> ঋণগ্রস্ত হলে ঋণ পরিশোধ করা।
> দুনিয়াবী সব ধরনের পেরেশানি ও সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়া।
> ইবাদত-বন্দেগির পরিমাণ বাড়িয়ে আত্মা বা দিলকে আল্লাহর প্রেমের উপযোগী করে তোলা।
> নামাজ, ইহরাম, বায়তুল্লাহ তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া সাঈর দোয়া ও করণীয়গুলো শিখে নেয়া।
> গুরুত্বপূর্ণ আমল ও দোয়াগুলো এখন থেকেই শিখতে শুরু করা।
> হজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘তালবিয়া’ বিশুদ্ধভাবে মুখস্ত করে নেয়া।
সর্বোপরি নিজেকে এভাবে তৈরি করা যে-
‘হজের সফর দুনিয়ার জীবনের শেষ সফর। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বাইতুল্লায় শেষ যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করা।’

হজের আগে যে অভ্যাসগুলো ত্যাগ করা জরুরি

> সব ধরনের মোহ, লোভ-লালসা ত্যাগ করা।
> সব ধরনের পাপ কাজ হতে বিরত থাকা।
> আভিজাত্য, পদমর্যাদা, গর্ব ও অহংকার ত্যাগ করা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা।
> ইবাদত ও জেয়ারতের প্রতিটি মুহূর্তে তাড়াহুড়া ও উদাসিনতারভাব ত্যাগ করা।
> দুনিয়াবী সব ধরনের অন্যায় কার্যক্রম থেকে নিজেদের বিরত রাখা।

বিশেষ করে
আর এভাবেই হজের মাধ্যমে বিচার দিবস ও কেয়ামত তথা পুনরুত্থান দিবসের কঠিন মহড়ার শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করে মৃত্যু পর্যন্ত তা মনে রাখা জরুরি।

হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সব নবি-রাসুলের আত্ম-বিসর্জনের যে শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব হজ পালনেচ্ছুদেরকে হজ্জে মাবরুর দান করুন। হজের আগে গ্রহণীয় ও বর্জনীয় কাজগুলো যথাযথ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।