এসএসসি পাশ সুদর্শনা-স্মার্ট এক ভুয়া আইনজীবী নারীর অভিনব যত প্রতারণা !

157

সুদর্শনা!  একইসাথে চটপটে আর  স্মার্ট নারী আইনজিবী। নাম, সুফিয়া খানম রিমি ওরফে মোছাম্মত মৌ। আদালতপাড়ায়  সবাই ডাকতেন ‘মৌ’ বলেই।  বয়স ৩৫ এর কোঠায় । দাপুটে আইনজীবী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন আদালতপাড়ায়।

মক্কেলদের কাছেও ছিলেন যেমনি জনপ্রিয় তেমনি আদালতপাড়ার অন্যান্যদের কাছেও পরিচিত ছিলেন বেশ কাজের মানুষ হিসেবেই। সবাই জানতেন, একইসাথে সুন্দরী আর স্মার্ট এই নারী আইনজিবী অন্যদের চাইতে আগে ভাগেই যে কোন কাজ বাগিয়ে নিতে জানেন সবার কাছ থেকেই।

এতকাল এভাবে চললেও তার এহেন কর্মততপরতায় বাগড়া দিয়েছেন টাউট উচ্ছেদ কমিটি এবার। পাঁচ বছর শিক্ষানবিশ আইনজীবী এবং দুই বছর আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু এবার অভিযোগ, আইন পেশায় থাকা এই নারীর আইনের সনদই নেই!

শুধু তাই নয়, ধরা পড়বার পর উঠে এসেছে আরও বেশ কিছু কঠিন অভিযোগ, মাত্র এস এস সি পাস করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে অনেক বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন লক্ষাধিক টাকা।

এসব অভিযোগে আটকের পর  সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে তাকে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক মোবারক হোসেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারী তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

কোতয়ালী থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মৌয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে কোতয়ালী থানায় একটি মামলা হয়েছে। তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

প্রতারনার অভিযোগে আটক হবার পর প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে নানা চঞ্চল্যকর তথ্য। সংশ্লিস্ট সুত্রমতে, সাত বছর আগে এলএলবি পাস করে বার কাউন্সিলে সদস্যভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন জানিয়ে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন ওই নারী। ২০১৮ সালে বার কাউন্সিল থেকে আইনজীবী হিসেবে সনদ পেয়েছেন মর্মে প্রচার করে ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। পাসের খুশির সংবাদে মহিলা আইনজীবী কমন রুমে ৫/৭ কেজি মিষ্টিও খাওয়ান সহকর্মীদের । এইচএসসি পাশ ওই নারী এভাবেই নারী-পুরুষ সকল আইনজীবীকে ফাঁকি দিয়ে আইন পেশা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

এর আগে গত রোববার তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতির টাউট উচ্ছেদ কমিটির কাছে ধরা পড়েন। আইনজীবী হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দান এবং জাল জালিয়াতির অভিযোগে সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান জুয়েল কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

ভুয়া আইনজীবী আটকের খবর জানাজানি হলে রবিবার দুপুরে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সামনে ভিড় করেন হাজারো আইনজীবী। আদালতপাড়ায় বেশ দাপুটে এই নারি আইনজীবী সহকর্মীকে দেখে অনেক আইনজীবীর চক্ষু চড়কগাছ হয় ।

এ বিষয়ে টাউট উচ্ছেদ কমিটির অন্যতম সদস্য ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘মোসাম্মৎ মৌ আদালতে অনেক প্রতারণা করেছেন। তিনি অনেক বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অথচ তার কোনো আইনের ডিগ্রি নেই। সাত বছর ধরে আইনজীবী পরিচয়ে প্রতারণা করে আসছেন। তিনি আরও জানান, এ ছাড়া তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা আইনজীবী সমিতির আইডি কার্ড তৈরি করে তার গলায় নিয়মিত পরিধান করতেন।’

ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘টাউট মৌয়ের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে হাজতে আছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি থানাধীন ১২/এ, ধানমন্ডি ৩২ এর বাসিন্দা জহিরুল হকের মেয়ে রিমি জাহান (২৯)। তিনি সুফিয়া খানম রিমি (মৌ) নাম ধারণ করে অন্য আইনজীবীর সদস্য নম্বর ব্যবহার করে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে আইনজীবীর পরিচয়পত্র তৈরি করেন। ওই পরিচয়ে তিনি দীর্ঘদিন বিচারপ্রার্থী নিরীহ জনগণের নিকট থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিলেন।

জানা গেছে, প্রতারক রিমি গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। এ ছাড়া, তিনি কয়েক বছর ধরে প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণাও করে আসছিলেন। তিনি আইনজীবী হিসেবে কোর্ট-গাউন পরে মামলার শুনানিও করতেন।

এ সম্পর্কে মামলার বাদি মেহেদী হাসান জুয়েল জানান, এইচএসসি পাস করেই ওই নারী নিজেকে এলএলবি পাস বলে বেশ কয়েক বছর আগে আইন অঙ্গনে আসেন। ২০১৮ সালে বার কাউন্সিল থেকে পাস করেছেন মর্মে প্রচার করে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে পরিচয়পত্র তৈরি করেন। তিনি পরিচয়পত্রে ঢাকা বারের আইনজীবী সদস্য সোফিয়া খামনের সদস্য নম্বর ২২৭৯০ ব্যবহার করে পরিচয়পত্র তৈরি করেন।

সূত্র : সময়ের কণ্ঠস্বর